রোলস রয়েস কেন এতো দামি

Chapter 1

রোলস রয়েস মূলত লাক্সারি গাড়ির একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া শুধু টাকা থাকলেই রোলস রয়েস কেনা যাবে, তাও না। একটি রোলস রয়েস কেনার জন্য সোস্যাইটাল স্ট্যাটাসও ম্যাটার করে। আর তাই, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, বিজনেস টাইকুন এবং সেলিব্রিটিদেরই বেশিরভাগ সময়ে এই লাক্সারি ব্র্যান্ডটির গাড়ি ব্যবহার করতে দেখা যায়। রোলস রয়েস ব্র্যান্ডটি ১০০ বছরের পুরনো হলেও, এখনো তারা তাদের সেই লাক্সারি কারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ইনফ্যাক্ট, ২০২০-এ তাদের সর্বনিম্ন মডেলের গাড়িটির মূল্য আছে ২ কোটি টাকারও বেশি। এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন রোলস রয়েস এত দামি? ❤️ 😂 😮 😢

শুরুতে জেনে নেয়া যাক, রোলস রয়েসের ইতিহাসটি। ১৯০৪ সালে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে চার্লস রোলস এবং হেনরি রয়েস নামে দুই ব্যক্তির হাত ধরে যাত্রা শুরু করে রোলস রয়েস। এদের মধ্যে চার্লস রোলস একজন পার্ট-টাইম রেসিং ড্রাইভার এবং কার ডিলার ছিলেন। অপরদিকে, হেনরি রয়েস একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, যিনি গাড়ি এবং উড়োজাহাজের ডিজাইনের জন্য বেশ পরিচিত ছিলেন। দুজন সম্মিলিতভাবে একটি মোটর কার কোম্পানি খোলার পরিকল্পনা করে একটি বিজনেস এগ্রিমেন্ট করেন। প্রথম রোলস রয়েস গাড়িটি ১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে মার্কেটে লঞ্চ হয়, যার নাম ছিল রোলস রয়েস 10HP। গাড়িটির টপ স্পিড ছিল ৩৯ মাইল পার আওয়ার বা ৬৩ কিলোমিটার পার আওয়ার এবং তখনকার এর দাম ধরা হয় ৩৯৫ ইউরো। ❤️ 😂 😮 😢

১৯০৬ সালে চার্লস রোলস এবং হেনরি রয়েসের নামানুসারে অফিশিয়ালি কোম্পানির নাম রোলস রয়েস লিমিটেড করা হয়। ১৯০৭ সালে রোলস রয়েসের সিলভার ঘোস্ট গাড়িটিকে 'দ্য বেস্ট কার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যদিও ১৯২৫ সালে গাড়িটির প্রোডাকশন বন্ধ করে দেয় তারা এবং ফ্যান্টম নামে একটি নতুন গাড়ি মার্কেটে লঞ্চ করে। ১৯২০-এর দশকে এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও অবদান রাখে রোলস রয়েস। ১৯৩১ সালে রোলস রয়েস স্পোর্টস কার মেকার কোম্পানি বেন্টলিকে কিনে নেয়। ১৯৩৬ সালে তারা ফ্যান্টম থ্রি গাড়িটি লঞ্চ করে যাতে প্রথমবারের মতো ভি-১২ ইঞ্জিনটি ব্যবহার করা হয়। পরের কিছু দশকে রেইথ, সিলভার ক্লাউড, ফ্যান্টম ফাইভ এবং সিলভার শ্যাডো এর মত বেশ কিছু লাক্সারি কার নিয়ে আসে রোলস রয়েস। ❤️ 😂 😮 😢

১৯৮০ সালে ব্রিটিশ ডিফেন্স কোম্পানি ভিকার্স ৯৩৩ মিলিয়ন ডলারে রোলস রয়েসকে কিনে নেয়। ১৯৮৫ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে অন্তর্ভুক্ত হয় রোলস রয়েস। ১৯৮৮ সালে ভিকার্স রোলস রয়েসকে বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জার্মান লাক্সারি কার ম্যানুফ্যাকচারার বিএমডব্লিউ ৩৪০ মিলিয়ন ইউরোতে রোলস রয়েসকে কিনে নেয়ার অফার করে। কিন্তু আরেক জার্মান অটোমেকার ফোকসওয়াগন ৪৩০ মিলিয়ন ইউরো অফারের মাধ্যমে বিএমডব্লিউকে বিট করে রোলস রয়েস কিনে নেয়। যদিও ১৯৯৮ সালে ৪০ মিলিয়ন ইউরোতে রোলস রয়েসকে নিজেদের সাবসিডিয়ারি হিসেবে কিনে রোলস রয়েসের ব্র্যান্ড নেম এবং লোগো নিজেদের নাম করে নেয় বিএমডব্লিউ। তখন থেকে এখন পর্যন্ত রোলস রয়েসের প্রোডাকশন করে আসছে বিএমডব্লিউ। ফ্যান্টম, ঘোস্ট, ডন, কালিনানের মত বেশ কিছু লাক্সারি কার তৈরি করে আসছে তারা। ❤️ 😂 😮 😢

২০১৯-এ রোলস রয়েস মোট ৫,১৫২টি গাড়ি বিক্রি করেছিল এবং তাদের রেভিনিউ ছিল ২১.১৮ বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া ২০২০-এর আগস্ট পর্যন্ত কোম্পানির মোট মার্কেট ভ্যালু আছে ৬.৩২ বিলিয়ন ডলার। যদিও রোলস রয়েস কখনো তাদের বেস প্রাইস প্রকাশ করে না, কিন্তু হিসেব মতে, ২০২০-এ তাদের সর্বনিম্ন মডেল রোলস রয়েস ঘোস্ট গাড়িটির মূল্য আছে প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি কারেন্সিতে প্রায় ২.৬ কোটি টাকা। যদি অন্যভাবে বলা হয়, তাহলে এই দামে আপনি টয়োটা করোলা'র ২০২০ মডেলের ১৬টি গাড়ি কিনতে পারবেন। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দামি রোলস রয়েস মডেলটি হচ্ছে রোলস রয়েস সোয়েপটেইল, যার দাম ধরা হয় ১৩ মিলিয়ন ডলার। এখন কথা হচ্ছে, রোলস রয়েসের এত দামের পেছনে কারণটা কি? সে বিষয়েই আলোচনা করা হবে এবার। ❤️ 😂 😮 😢

রোলস রয়েসের দামের পেছনের প্রধান একটি কারণ হচ্ছে এর ব্র্যান্ড ভ্যালু। বিশ্বের সব নামিদামি ব্র্যান্ডের অটোমোবাইল কোম্পানির মধ্যে চলে আসে এর নাম। এমনকি র‍্যাংকিং দ্য ব্র্যান্ডস-এর পপুলার ব্র্যান্ডের লিস্টে ১২ নাম্বার পজিশনে অবস্থান করছে রোলস রয়েস। মূলত রোলস রয়েস মার্কেটে এমন একটি ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করেছে, যে লাক্সারি কারের কথা শুনলেই সবার মনে রোলস রয়েসই চলে আসে। এই ব্র্যান্ড ভ্যালুকে কাজে লাগিয়েই রোলস রয়েস কয়েক যুগ ধরে লাক্সারি কার মার্কেটে একটি বিশাল অবস্থান ধরে রেখেছে। ❤️ 😂 😮 😢

অন্যান্য অটোমোবাইল কোম্পানির মতো রোলস রয়েস একই সাথে অত্যাধিক পরিমাণ গাড়ি ম্যানুফ্যাকচার করে না। অর্থাৎ রোলস রয়েসের প্রত্যেকটি মডেলেরই লিমিটেড অ্যামাউন্টের প্রোডাকশন হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে তারা মোট ৪,৩৫৩টি গাড়ি ম্যানুফ্যাকচার করেছিল। যদি অন্যান্য ব্র্যান্ডের সাথে কম্পেয়ার করতে চাই, তাহলে ২০১৮ সালে জনপ্রিয় অটোমোবাইল কোম্পানি টয়োটা ১০.৫২ মিলিয়ন এবং ফোকসওয়াগন ১০.৮ মিলিয়ন গাড়ি ম্যানুফ্যাকচার করে। হিসেব মতে, প্রতিটি ফ্যান্টম মডেলের গাড়ি তৈরি করতে দুই মাস সময় নেয় তারা। এতে করে বোঝাই যায়, রোলস রয়েস গাড়িগুলো বেশ ইউনিক এবং লিমিটেড। ❤️ 😂 😮 😢

রোলস রয়েস গাড়ির অধিকাংশ পার্টস-ই হ্যান্ডমেড। ইন্টেরিয়র হোক কিংবা এক্সটেরিয়র, প্রায় সবকিছুই দক্ষ ক্রাফটসম্যান দ্বারা তৈরি করা হয়ে থাকে। স্পিরিট অফ এক্সট্যাসি নামে তাদের যে বোনেট অর্নামেন্ট স্কাল্পচারটি আছে, সেটিও হাতেই তৈরি করা হয়। এমনকি গাড়ির যে রেডিয়েটর গ্রিলটি আছে, সেটি কোনো প্রকার মেজারিং ইন্সট্রুমেন্ট ছাড়াই, শুধুমাত্র চোখের আন্দাজে সম্পূর্ণভাবে হাতে তৈরি করা হয়ে থাকে। সাধারণত একজন মেকারের একদিন লেগে যায় একটি রেডিয়েটর তৈরি করার জন্য। তারপর ৫ ঘণ্টা সময় লাগে এটিকে পলিশ করতে। ❤️ 😂 😮 😢

রোলস রয়েসের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে এর কাস্টমাইজেশন অপশন। একজন কাস্টমার চাইলেই ইন্টেরিয়র থেকে এক্সটেরিয়র পর্যন্ত সবকিছু নিজের মনমতো করে ডিজাইন করে নিতে পারবে। রোলস রয়েসের কাছে প্রায় ৪৪,০০০ কালার প্যালেট রয়েছে, যেখান থেকে যেকোনো কালার চুজ করে কাস্টমাইজ করা সম্ভব। তাছাড়া কোনো কাস্টমার চাইলে তার পছন্দের যেকোনো কিছু কালার রেপ্লিকেটও করতে পারবে। তবে কোনো কাস্টমার যদি পূর্বে সেই কালারটি ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে পারমিশন নিতে হবে সেই কালারটি ব্যবহার করার জন্য। ❤️ 😂 😮 😢

শুনলে হয়তো অবাক হবেন, রোলস রয়েস গাড়িতে যে নিখুঁত পিনস্ট্রাইপস থাকে, সেটি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি করে থাকেন। তিনি হচ্ছেন মার্ক কোর্ট। তাকে রোলস রয়েসের কোচলাইনার বলা হয়ে থাকে। একমাত্র তিনিই এই নিখুঁত কাজটি করতে পারেন বলে বিভিন্ন দেশ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় পেইন্টিংয়ের জন্য। প্রতিটি গাড়িতে পিনস্ট্রাইপস করতে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নেন তিনি এবং প্রতিটি কাজই খুবই নিখুঁত হয়। যার জন্য রোলস রয়েস থেকে তাকে একটি বিশাল অ্যামাউন্টের স্যালারি দেয়া হয় শুধুমাত্র এই পেন্টওয়ার্কের জন্য। ❤️ 😂 😮 😢

রোলস রয়েস গাড়িগুলোর দামের পেছনে আরেকটি কারণ তাদের ইউনিক ডিজাইন। গাড়ির ভেতরের ছাদে নাইট স্কাইয়ের ইফেক্ট ফুটিয়ে তোলার জন্য স্টারলাইট ফিচার যুক্ত করা হয়। প্রতিটি গাড়িতে এই ফিচারটি ইনস্টল করতে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে। ড্রিল করে ছোট ছোট ফাইবার অপটিক্স লাইট ম্যানুয়ালি বসানো হয় গাড়ির ছাদে। কাস্টমাররা চাইলে স্টারলাইট কাস্টমাইজও করতে পারবে নিজেদের মত করে। তাছাড়া দক্ষ টেইলর দ্বারা গাড়ির ভেতরে থ্রিডি এমব্রয়ডারির কাজও করে থাকে তারা। সবচেয়ে কমপ্লেক্স ডিজাইনের এমব্রয়ডারি করা হয়েছিল একটি রোলস ফ্যান্টম মডেলে, যাতে প্রায় ১ মিলিয়ন সেলাই দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া রোলস রয়েস গাড়ির প্রতিটি চাকা এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যাতে করে গাড়ি চলার সময় কিংবা ব্রেক করার পরেও আর.আর লোগোটি সবসময় সোজাভাবেই থাকবে। এর জন্য তারা প্রতিটি গাড়ির চাকায় একটি কাস্টম সিস্টেম ইন্সটল করে রেখেছে, যা গাড়ি চলার সময় বা ব্রেক করার সময় অটোমেটিক্যালি অ্যাক্টিভেট হয়ে যায়। ❤️ 😂 😮 😢

সাইলেন্ট রাইডের জন্য রোলস রয়েস তাদের প্রত্যেকটি গাড়ির কেবিনের চারদিকে প্রায় ৩০০ পাউন্ড সমান অ্যাকোস্টিক ইন্সুল্যাশন যুক্ত করে থাকে। তাছাড়া তাদের টায়ার ম্যানুফ্যাকচারার কন্টিনেন্টাল এজি রোলস রয়েসের জন্য একপ্রকার স্পেশাল ফোম ফিল্ড টায়ার তৈরি করে থাকে, যা প্রায় ৯ ডেসিবেল পর্যন্ত নয়েজ কমাতে সক্ষম। ❤️ 😂 😮 😢

রোলস রয়েসের গাড়িতে বেশ কিছু অ্যাডভান্সড টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, রাডার সেন্সর, পজিশন সেন্সর, প্রেসার সেন্সর, ভার্চুয়াল বার্ড আই ভিউ সেন্সর ইত্যাদি। আবার রোলস রয়েসের প্রত্যেকটি গাড়ির অডিও সিস্টেম বেশ উন্নত। এমনকি বিল্ট-ইন মাইক্রোফোনও দেয়া থাকে স্পিকারের সাথে। মিউজিক কন্ট্রোলের জন্য আলাদা ডেডিকেটেড ডায়াল রয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি সিটের পেছনে একটি ট্যাবলেট স্ক্রিন রয়েছে, যাতে ডিরেক্ট মোবাইল থেকে কাস্টিং অপশনও রয়েছে। গাড়ির প্রতিটি দরজার সাথে একটি ছাতাও দেয়া থাকে, যা একটি সুইচ ক্লিক করলে অটোমেটিক্যালি বেরিয়ে আসে। এরকম আরো বিভিন্ন টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়ে থাকে রোলস রয়েসে, যা এর বিশাল দামের অন্যতম একটি কারণ। ❤️ 😂 😮 😢

এর সব ছাড়াও আরো বিভিন্ন কারণে রোলস রয়েস বিশ্বের সবচেয়ে দামি গাড়িগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তবে রোলস রয়েসের এত দামের পেছনে আপনার কাছে কোন কারণটি বেশি যৌক্তিক লেগেছে? কমেন্ট করে আমাদের জানাতে ভুলবেন না। ❤️ 😂 😮 😢

Advertisement
Ad Space Available
Previous Next
Join the Chapter Discussion
SPEED
18px
1.8